শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

মুক্তির রাজপথ কতদূর

 à¦®à¦¾à¦¨à¦¬ জীবনে প্রতিটি বছরই সংগ্রামের এক মহাকাব্য। তবে সংগ্রামের চালচিত্রে বৈচিত্র্য থাকে, স্লোগানেও থাকে ভিন্নতা। কারণ, চ্যালেঞ্জগুলো সবসময় এক রকম থাকে না। ’৪৭, ’৫২, à§­à§§, ’à§­à§«, ’৯০ এবং ২০২৪-এর চ্যালেঞ্জগুলো কি এক রকম ছিল? তবে এইসব চ্যালেঞ্জের চেতনায় মিল ছিল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চেতনা মানুষকে করেছে সংগ্রামমুখর। আমার পিতামহের সংগ্রামের সাথে আমার পিতার সংগ্রামে ভিন্নতা ছিল, আর পিতার সাথে ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায় পুত্রের সংগ্রামেও। তবে কারণ ও রূপে ভিন্নতা থাকলেও চেতনায় সবাই প্রতিবাদী। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ফলে বলা চলে, প্রিয় এই পৃথিবীতে মানুষের প্রকৃত জীবন হলো ‘সংগ্রামমুখর জীবন’। কারণ আমাদের এই গ্রহটা কোনো জান্নাত নয়।

২০২৪ সালের রয়েছে নানা রঙ। তবে বিপ্লবের রংটাই এখানে উজ্জ্বল। ফলে ২০২৪ সালকে আমরা বিপ্লবের বছর হিসেবেই অভিহিত করছি। কিসের বিরুদ্ধে বিপ্লব? অন্যায়-অবিচার, শোষণ-বঞ্চনা, লুন্ঠন-পাচারের বিরুদ্ধে বিপ্লব। এক কথায় মানুষ বলছে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লব, যার প্রতীক শেখ হাসিনা। বিপ্লব তো হলো, কিন্তু মুক্তির রাজপথ কতদূর? আমরা সঠিক সড়কে হাঁটছি তো? জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে যারা রাজপথে নেমেছিলেন তারা এক মত ও এক পথের পথিক ছিলেন না; জাতীয়তাবাদী, ইসলামী, বাম, নানা ধর্ম ও নৃ-গোষ্ঠীর মানুষরা শরিক হয়েছিলেন সেই সংগ্রামে। এমন অসম্ভব সম্ভব হলো কেমন করে? অভিন্ন লক্ষ্যই ছিল মূল কারণ। এক দানবকে সরাতে সবাই একত্রিত হয়েছিলেন। দানব তো পালালো, পরাভূত হলো। কিন্তু যে কাজের মাধ্যমে মানব-দানবে পরিণত হলো, সেইসব অপকর্মের বিরুদ্ধে বিজয়ী হতে কী ঐক্যের প্রয়োজন নেই? ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস ছাড়া কি আমরা মানুষের মুক্তির রাজপথ নির্মাণ করতে পারবো? আগে ঐক্যের কথা বেশি শোনা যেত, এখন বেশি শোনা যাচ্ছে নির্বাচনের কথা। 

সংস্কারের কথাও শোনা যাচ্ছে। তবে সংস্কারের মাত্রা ও সময় নিয়ে বিতর্ক আছে। তথ্যভিত্তিক যৌক্তিক বিতর্ক ভালো বিষয়, তবে এখানে সন্দেহ-সংশয় ও দোষারোপের রাজনীতিও চলছে। জুলাই বিপ্লবের চেতনার সাথে এগুলো যায় না। আমরা জানি, গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবের কাজের সাথে দেশ গড়ার কাজে রয়েছে ভিন্নতা। বিষয়টি তো অন্তর্বর্তী সরকার, রাজনৈতিক দলসমূহ এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের না বোঝার কথা নয়। কাউকে দোষারোপ না করে আমরা বলতে চাইছি, স্টেকহোল্ডারা কি তাদের কাজগুলো আরো সুন্দরভাবে, স্বচ্ছতার সাথে এবং সময়ের সাথে সঙ্গতি রেখে করতে পারেন না? কারণ এটা কোনো সাধারণ সময় নয়, আপনারা এক ঐতিহাসিক সময় পার করছেন। ইতিহাসের চোখ আপনাদের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রয়োজনে আপনারা আরো উপদেষ্টা নিন, দেশপ্রেমিক জনশক্তি নিন; কিন্তু কোনোভাবেই ব্যর্থ হওয়া যাবে না। ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে যারা ছিলেন, তাদের মনোনীত সরকারই তো বর্তমান সরকার। ফলে এই সরকার কিংবা আন্দোলনের নেতা-কর্মী এবং জনতা ব্যর্থ হতে যাবে কেন? তারা ঐক্যবদ্ধভাবে তো বিশাল এক কাজ করেছেন। তবে এখানে একটা ‘কিন্তু’ আছে। কিন্তুটা হলো, কারো নিয়তে কোনো দূষণ ঘটে যায়নি তো? দূষণের কীট বড় বড় ইমারতকেও ধসিয়ে দিতে পারে। আর মানুষের মন তো খুবই দুর্বল। একমাত্র নৈতিক শক্তিই মানুষের মনকে স্থিতি দিতে পারে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে পারে লোভ-লালসাকে। রাজনৈতিক অঙ্গনে বহুল উচ্চারিত একটি কথা হলো-ব্যক্তির চাইতে দল বড়, দলের চাইতে দেশ বড়। দেশ বড় থাকলেই মঙ্গল। অবশ্য কথা-কাজে এর প্রমাণ থাকা চাই। অনেকেই এখন একথা বলছেন। সম্প্রতি জুলাই অভ্যুত্থানের কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘একটা বড় ধরনের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশে পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তন যদি আমাদের কাজে-কর্মে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে খুব দুর্ভাগ্যজনক হবে। যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই অভ্যুত্থানের জন্ম হলো, সেটাকে ধারণ করতে হবে। যে কাজ করবো, সেটা দেখে মানুষ যেন মনে করে বড় পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তনটা যেন চোখে লাগে।’

বাংলাদেশের পরিবর্তনটা বিশে^র মানুষ দেখেছে। বৃটিশ সাপ্তাহিক দ্য ইকোনমিস্ট-এর বিবেচনায় বাংলাদেশ বিশে^র সেরা দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সেরা দেশ হিসেবে নির্বাচনের আগে দ্য ইকনোমিস্ট-এর দক্ষিণ এশীয় সম্পাদক লিনা শিপার বাংলাদেশে এসেছিলেন। শেখ হাসিনার পতনের একদিন আগে তিনি ঢাকায় পৌঁছান। লক্ষ লক্ষ মানুষের মুক্তির আকাক্সক্ষা এবং সংগ্রাম তিনি দেখেছেন। এটি যে দেশের মানুষের সম্মিলিত আশা ও দাবির প্রকাশ, তাতে তাঁর কোনো সন্দেহ নেই। কর্মসূত্রে বাংলাদেশে তিনি বহুবার এসেছেন। মুখ ফুটে কথা বলতে ভীত মানুষের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছে। 

তবে হাসিনার পতনের পর তিনি আবিষ্কার করলেন, বাংলাদেশের মানুষ আর ভীত নয়। মানুষ যখন একবার ভয়কে জয় করে ফেলে, তখন আর বন্দুকের নল দেখিয়ে তাদের কাবু করা সহজ হয় না। লিনা শিপার এই নতুন বাংলাদেশকে ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি’ বলে চিহ্নিত করেছেন। 

জুলাই বিপ্লবে বাংলাদেশে স্বৈরশাসনের পতন হয়েছে, তবে ইকোনমিস্ট-এর চোখে এর চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, স্বৈরাচারের পতনের পর যে সম্ভাবনার দ্বার খুলে গেছে এবং বাংলাদেশ যেভাবে তার সদ্ব্যবহার করছে সেই প্রসঙ্গটি। উল্লেখ্য যে, ইকোনমিস্ট-এর ফরেন এডিটর প্যাট্রিক ফাওলস-এর নেতৃত্বে সেরা দেশ নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয়। এক পডকাস্টে তিনি বলেছেন, ‘ভবিষ্যতে কী হবে জানি না, কিন্তু আশার কথা, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দেশটি ইতিমধ্যেই স্থিতিশীলতা অর্জনের পথে অগ্রগতি অর্জন করেছে। আইন-শৃংখলার উন্নতি হয়েছে, ব্যাংকিংসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক খাতে পূর্বের অরাজকতা দূর হয়েছে। দেশটি সঠিক পথেই এগোচ্ছে।’ তবে প্যাট্রিক ফাওলস-এর ‘ভবিষ্যতে কী হবে জানি না’ কথাটি আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। কারণ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বর্তমান সময়ের স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গত ভূমিকার ওপর। এখানে ব্লেমগেমের কোনো সুযোগ নেই। সরকারের ভেতরের লোকদের যেমন দায়িত্ব আছে, তেমনি দায়িত্ব আছে বাইরের বিভিন্ন মহলের ওপরও।

ইকোনমিস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ‘বিপ্লব’ বলেছে। বিপ্লবের ইতিহাস মানুষ জানে। রুশ বিপ্লবের পর রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ সামাল দিতে দেশটিতে সময় লেগেছে ছয় বছর। চীনা বিপ্লবের পর দেশটিতে অশান্ত সময় কেটেছে বহু বছর। প্রায় এক দশক পরও অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ এবং বাইরের নাশকতা মোকাবিলা করতে হয়েছে দেশটিকে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি অবশ্য সে রকম নয়। তবে একটি বিষয় তো স্পষ্ট যে, পতিত ফ্যাসিবাদের দোসররা দেশে-বিদেশে সক্রিয় রয়েছে জুলাই বিপ্লবের বিরুদ্ধে। তাই বিপ্লব পরবর্তী সময়েও দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে সর্বমহলকে। বিভাজনের ক্ষুদ্র রাজনীতিকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেয়া যাবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ